ইটাহারের পুজোয় একই বৃন্তে দুটি কুসুমের গন্ধ

তিপ্পান্ন পেরিয়ে চুয়ান্নয় পা। প্রাচীন নয়, তবে সদর ইটাহারে সবচেয়ে পুরোনো যে তিনটি পুজো রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম। কালক্রমে উল্কা ক্লাবের এই পুজোই এখন ইটাহার ব্লকের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় দুর্গোৎসব। মণ্ডপসজ্জা থেকে আলোকসজ্জা, প্রতিমা নির্মাণ, আদিবাসী নাচগান মায় মণিমেলার আয়োজন সব মিলিয়ে পুজোর জাঁকজমক ও দর্শনার্থীর ভিড় রীতিমতো টেক্কা দেয় যেকোনো ছোটো শহরের পুজোকে।

কিন্তু জৌলুস আর আলোর রোশনাইয়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছে এ পুজোর ইতিহাস। লোকের মুখে মুখে উল্কা ক্লাবের পুজো এখন পরিচিত বিধায়ক অমল আচার্যর পুজো হিসেবে। এ পরিচয় অলীক নয়। কিন্তু পুজোকে ঘিরে আজকের যে রাজকীয় আয়োজন তার শিকড় কোথায়? এই শিকড়ের সন্ধান করতে গিয়ে জানা গেল, এ পুজোর ইতিহাসে মিশে আছে একই বৃন্তে দুটি কুসুমের গন্ধ। এক অকৃত্রিম সম্প্রীতির সুরে বাঁধা বর্তমান উল্কা ক্লাবের পুজোর তান। এখনও কান পাতলে শোনা যায় সেই আবহমান সুর। কারণ প্রথম দিন থেকেই উল্কার পুজো উদ্যোক্তাদের মূল মন্ত্র একটাই মিলে সুর মেরা তুমহারা, তো সুর বানে হামারা। অর্ধ শতাব্দী আগের কথা। এ তল্লাটে তখন একটিই মাত্র পুজো হত। হাটখোলায় থানা সর্বজনীনের পুজো ঘিরেই ছিল সদর ইটাহারবাসীর শারদোৎসব।

পুজোর কটা দিন হাটখোলা যখন উ‌ৎসবমুখর, তখন উলটো দিকে চৌরাস্তা মোড়ের নিঝুম সন্ধ্যায় বসে আড্ডা মারতেন গুটিকয়েক তরুণ। প্রিয়প্রসাদ আচার্য (মণি), সামসুল হক, অরুণ মুন্সী, নরেন্দ্রনাথ ঘোষ ও রাধেশ্যাম দাস (মন্টু ডিলার)। এখন যেখানে উল্কা ক্লাবের পুজোমণ্ডপ, তার পাশেই ছিল তাদের ঠেক। পাঁচ জনের এই দলটির নাম ছিল পঞ্চম বাহিনী। তখন চৌরাস্তা শাসন করত এই পঞ্চম বাহিনীই। পরের দিকে তাদের সঙ্গে যোগ দেন দাসপাড়ার দীনেশচন্দ্র দাস, ভদ্রশীলার সূর্য সরকার, উত্তরপাড়ার কামরুল হক, চাভোটের যোগেন্দ্রনাথ দাস, চৌরাস্তা মোড়ের সফিলুদ্দিন আহমেদ, দর্জিপাড়ার বিভাস সরকার, হরিপদ ঘোষরা।

এদের সকলের মাথার উপরে উপদেষ্টা ছিলেন বর্তমান বিধায়ক অমল আচার্যর বাবা বিজয় আচার্য। গ্রামে ডাক্তারি করতেন বলে এলাকায় বিজয় ডাক্তার নামে খ্যাত ছিলেন তিনি। মান্যগণ্য ও প্রভাবশালী মানুষ। তিনিই ওই পাঁচ তরুণের নাম দেন পঞ্চম বাহিনী। ১৯৬৬ সালে বিজয় আচার্যর তত্ত্বাবধানে এই পঞ্চম বাহিনীই প্রথম চৌরাস্তা মোড়ে শুরু করে দুর্গাপুজো। পঞ্চম বাহিনীর উদ্যোগে বাগান থেকে বাঁশ কেটে এনে বেড়া ও টিনের চাল দিয়ে তৈরি হয় মণ্ডপ। পুজো প্রস্তুতির তদারকিতে ছিলেন আরও দুই ব্যক্তি ব্রহ্মপদ আচার্য ও শক্তিপদ আচার্য। প্রথম পুজো কমিটির সভাপতি করা হয় সামসুল হকের বাবা জমিরুদ্দিন আহমেদকে। তবে বছর পাঁচেক পরে উল্কা ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ক্লাবের হাতেই পুজোর ভার তুলে দেয় পঞ্চম বাহিনী।

উল্কা ক্লাবের অন্যতম প্রবীণ কর্তা বিমল আচার্য স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমরা তখন নিতান্তই কিশোর। তখন সদর ইটাহারে পুজো হত শুধু হাটখোলায়। আর একটা পুজো ছিল খামরুয়া গ্রামে। আমার বেশ মনে আছে, আমাদের গ্রাম চাভোট থেকে মায়ের সঙ্গে মহিষের গাড়ি চেপে খামরুয়া ও ইটাহার হাটখোলার পুজো দেখতে যেতাম। আমার বাবা, বিজয় আচার্যও একাধিকবার হাটখোলা থানা সর্বজনীন পুজো কমিটির সম্পাদক হয়েছিলেন। বাবা যেবার সম্পাদক হতেন সেবার পুজোর চারটে দিন ডাকবাংলোর ঘরেই ক্যাম্প করে পড়ে থাকতেন। ছয়ের দশকের মাঝামাঝিতে একবার থানা সর্বজনীন পুজো কমিটির কয়েজনের মধ্যে মনোমালিন্য হয়। তার পরেই চৌরাস্তা মোড়ে শুরু হয় আরেকটি পুজোর।

ক্লাবের বর্তমান সভাপতি তথা প্রবীণ সদস্য হাইদুল হক বলেন, আমার কিশোরবেলা থেকেই দেখে আসছি, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সমস্ত সম্প্রদায়ে মানুষ এখানে মিলেমিশেই পুজো করে। সেই ধারা আজও অব্যাহত। চাঁদা তুলে পুজোর আয়োজন থেকে মায়ের বিসর্জন পর্যন্ত আমরা সব সম্প্রদায়ের মানুষ এই উৎসব পালন করি। ক্লাবের সম্পাদক তথা ইটাহারের বিধায়ক অমল আচার্য বলেন, সম্প্রীতি সারা বাংলার মতো ইটাহারের মাটিরও ঐতিহ্য। বাংলার মাটিতে বিভেদের কোনও স্থান নেই। সকলকে একসঙ্গে শামিল করে আনন্দ উদ্‌যাপনের নামই তো উৎসব। তাই প্রথম থেকেই আমরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকে নিয়ে এই মিলন উৎসব উদ্‌যাপন করি।

জোহরের নমাজ পড়তে মসজিদে গিয়েছিলেন সামসুল হক। পঞ্চম বাহিনীর শেষ জীবিত সদস্য। বয়স আশির চৌকাঠে। উত্তরপাড়ায় বাড়ির উলটো দিকেই মসজিদ। কিছুক্ষণ পর নমাজ শেষে বেরিয়ে এলেন তিনি। মাথায় নমাজি টুপি। পুজোর প্রসঙ্গ তুলতেই চোখেমুখে ঝিলিক। একসঙ্গে যেন কত স্মৃতির ঢেউ আছড়ে পড়ল তাঁর মন-যমুনায়। বললেন, ‘ওফ! সে ছিল একদিন। তখন তো আমরা ইয়ং। ওই জায়গায় একটা বড় খাল ছিল। মাটি দিয়ে খাল ভরে বাঁশ কেটে বেড়া বানিয়ে দুর্গার মন্দির তৈরি করলাম আমি, মন্টু ডিলার, অরুণ মুন্সী, নরেন ঘোষ আর মণিদা মিলে। তখনও ইটাহারে বিদ্যুৎ আসেনি। রাতে জ্বালানো হত হ্যাজাক।‘

এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে একটু থামেন অশীতিপর বৃদ্ধ। চোখের কোণে উঁকি দিচ্ছে হারানো দিনের স্মৃতি। ফের বলতে শুরু করেন, ‘তখন তো ধর্ম বা উৎসব নিয়ে মানুষের মনে কোনো ভেদাভেদ ছিল না। সকলের দুঃখে ও আনন্দে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়তাম। আমাদের মনেও হিন্দুদের দেবদেবী সম্পর্কে ভক্তি ও ভয় ছিল। এখন তো মানুষের সেই ভক্তিভাবটাই কমে গেছে। এখনকার পুজোতে বাইরের চমকটাই বেশি। বাইরের জৌলুস য়ত বেড়েছে, মনের দূরত্বও যেন ততই চওড়া হয়েছে।‘ সামসুলের গলায় বেদনার সুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

WhatsApp chat