NRC নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের তর্জা এখন তুঙ্গে ৷ অনেকেই মনে করছেন আইন করেছে বিজেপি এবং সেটা মুসলিম বিতারণের জন্য ৷ তাদেরকে জানিয়ে রাখি নাগরিকতা আইন যখন তৈরি হয়েছে তখন বিজেপির জন্মই হয়নি এবং এর সাথে হিন্দু মুসলমানের কোন সম্পর্ক নেই ৷ ভারত স্বাধীনকালে ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়নি ৷ যদিও দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে বিভাজিত পাকিস্থানকে আলিজিন্না মুসলিম রাষ্ট্র ঘোষণা করেছিলেন ৷ ভারতীয় সংবিধানের ১১নং ধারাবলে ১৯৫৫ সালে তৎকালীন কংগ্রেস সরকার পার্লামেন্টে প্রথম নাগরিকতা আইন প্রনয়ণ করে ৷ অসমিয়াদের অস্তিত্ব রক্ষার দাবিতে কেবলমাত্র অসমে এই আইন বলে NRC করার কথা বলা হয় যা বর্তমানে বিজেপি সরকারের নেতৃত্বে চালু হয়েছে ৷ এখানে হিন্দু মুসলিমের কোন উল্লেখ নেই ৷ আইনটি পরবর্তি কালে সারা ভারতে কার্মকর করতে ১৯৫৭, ‘৬০, ‘৮৫, ‘৮৬, ‘৯২ এবং সর্বশেষ ২০০৩ সালে সংশোধন করা হয়েছে ৷ শেষ সংশোধনীতে অনেক কথাই বলা হয়েছে ৷ এর মধ্যে অনেকের সংশয় দূর করার মতো কথা হল – ২০০৩ সালের আগে কোন শিশু ভারতে জন্মালে এবং তার পিতা মাতার অন্তত একজন ভারতীয় নাগরিক হলে শিশুটি ভারতীয় বলে গণ্য হবে ৷ এটি জন্মসূত্রে নাগরিকতা অর্জন পদ্ধতি ৷

২০০৩ সালের নাগরিকতা সংশোধনী আইনে আরও বলা হয়েছে, ১৯৯২ সালের মধ্যে বা তার পরে কোন শিশুর জন্ম ভারতের বাইরে হলেও তার পিতা মাতার একজন যদি ভারতীয় হয় এবং সংশ্লিষ্ট শিশুটি যদি অন্য রাষ্ট্রের নাগরিকতা না গ্রহণ করে থাকে তবে সে ভারতীয় নাগরিকতা লাভ করতে পারবে ৷ এটিও জন্মসূত্রে নাগরিকতা অর্জন পদ্ধতি ৷

আবার অনুমোদন সূত্রে নাগরিকতা ব্যষ্টিগত এবং সমষ্টিগত পদ্ধতিতে লাভ করা যায় ৷ ব্যষ্টিগত পদ্ধতিতে নাগরিকতা লাভ করতে গেলে আবেদনকারীকে ১০ বছর ভারতে বাস করার প্রমাণ দিতে হবে ৷ অন্যদিকে কোন অঞ্চল হঠাৎ কোন দেশের অর্ণ্তভুক্ত হলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বাসিন্দারা সমষ্টিগত অনুমোদন পদ্ধতিতে সেই দেশের নাগরিকতা লাভ করতে পারবে ৷ যেমন নরেন্দ্র মোদীর আমলে ভারতের বাংলা সংলগ্ন ছিটমহল সমস্যার সমাধান এই পদ্ধতিতে হয়েছে ৷

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে নাগরিকতা নিয়ে বাংলার জনমহলে যে সংশয় দেখা দিয়েছে তা মূলত শরণার্থী এবং অনুপ্রবেশকারীদের কেন্দ্র করে এবং সংশ্লিষ্ট দুই ধরনের মানুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ৷ এতকাল বুলবুলিতে সব ধান খেয়ে গেলেও কোন রাজনৈতিক দলেরই হুশছিলো না ৷ বর্তমানে কেন্দ্র সরকারের নেতৃত্বে নাগরিকতা নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করতেই রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে শুরু হয় কাদা ছোড়া ছুড়ি ৷ বিশেষ করে অসমে NRC চালু হওয়ার পরেই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি গোটা ভারতে বিশেষ করে বাংলার জনমানসে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয় ৷ বাংলার আতঙ্কিত উদ্বাস্তদের প্রতি আশার সংবাদ হলো আসামের NRC-র সাথে বাংলার NRC-র বিস্তর ফারাক আছে ৷ কেবলমাত্র অসমের জন্য আইনটি পূর্বেই পাশ হয়েছিলো ৷ কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে এখন প্রস্তুতি চলছে ৷ আর তার জন্য চলছে নাগরিকতা বিষয়ে পরবর্তি সংবিধান সংশোধন যেটা অমিত শা’র মুখে ইতিমধ্যে অনেকেই শুনেছেন ৷ অতএব বাংলায় এন আর সি চালু হওয়ার দুটি শর্ত অপেক্ষা করছে ৷ প্রথমত সংবিধান সংশোধন ও দ্বিতীয়ত তৃনমূল সরকারের উৎখাত ৷

(চলবে)
লেখকঃ বিশিষ্ট শিক্ষক ও কবি
(মতামতের সম্পূর্ণ দায় লেখকের)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

WhatsApp chat